Skip to main content

তারাবীহর নামাজের রাকাত নিয়ে একটি পর্যালোচনামূলক আলোচনা

তারাবীহর নামাজের রাকাত নিয়ে একটি পর্যালোচনামূলক আলোচনা:-

মুফতি মাওলানা মুহাম্মাদ কাওসার আলম দা:বা:
দাওরা হাদিস (ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট), কামিল  A+ ( হাদিস,তাফসির,ফিকাহ)
মুহাদ্দিস : ছারছিনা দারুসসুনাহ নেছারিয়া দ্বীনিয়া , নেছারাবাদ,পিরোজপুর,বরিশাল ।
সাবেক মুহাদ্দিস : দারুল আবরার মডেল মাদ্রাসা, রুপাতলী, বরিশাল  ।

সাবেক মুফতি ভান্ডারিয়া সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, রাজবাড়ী সদর, রাজবাড়ী  ।

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।

সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার। যাবতীয় যা কিছু সবই তার নিকট প্রত্যাবর্তিত। উল্লেখিত সিরোনামের উপর আলোচনার পূর্বে ভূমিকা স্বরুপ দু’টি কথা - যাদের কোরান-সুন্নাহ সম্পর্কে সাম্যক ধারণা আছে এবং যারা শুধুমাত্র আবেগের পুজারী নয়, যাদের বাস্তব বিবেক-বিবেচনা শক্তি রয়েছে, যারা কিছু বলার আগে ভেবে নেয়, সিদ্বান্ত দেওয়ার পূর্বে চিন্তা-গবেষণার আশ্রয় নেয়, যারা সত্য অনুসন্ধিৎসু, তাদের নিকটে আমার গবেষণালব্ধ এক বাক্য “ সাধারণ মানুষের জন্য কোরান-হাদিস সরাসরি দলিল নয়, বরং যারা মুজতাহিদ (মুজতাহিদ হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কতগুলো শর্ত রয়েছে) তাদের জন্য দলিল”। যে সকল বন্ধুগণ ঝগড়া-বিবাদ পছন্দ করেন না, কোরান-সুন্নাহর বাস্তব ও সঠিক ফয়সালা অনুযায়ী আমল করতে আগ্রহী, যাদের হৃদয়গুলো বক্রতার শিকলে আবদ্ধ নয় এবং যারা ‘অল্প বিদ্যা ভয়ংকর’ এর পাত্র নয়, তারা উক্ত বাক্যটির যথার্থতা বিবেচনা করে বলুন-উক্ত বাক্যটি বলা সঠিক না বেঠিক ? প্রমাণ স্বরূপ আমরা বলব, কোরান শরীফের কিছু আয়াতের হুকুম অন্য কিছু আয়াতের হুকুমের সাথে মতবিরোধপূর্ণ। যেমন:- আল্লাহ তায়ালার বানী- يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى অর্থাৎ- হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় নামাজের নিকটবর্তী হয়ো না (সূরা নেসা, আয়াত নং-৪৩)। এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, শুধুমাত্র নামাজ পড়া অবস্থায় মদ পান করা নিষেধ,অন্য সময় জায়েজ। আবার অন্য আয়াতে সর্বাবস্থায় মদ পান নিষেধ করা হয়েছে। যেমন:- আল্লাহ তায়ালার বানী- يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ অর্থাৎ- হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ,জুয়া, মূর্তি ও লটারির তীর শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা এ সব কাজ থেকে বিরত থাক। অবশ্যই তোমরা সফলকাম হবে।(সূরা মায়েদা, আয়াত নং-৯০)।
অনূরুপভাবে কোরানের কিছু আয়াতের শব্দাবলী দ্ব্যর্থাবোধক। যেমন:- আল্লাহ তায়ালার বানী- وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ অর্থাৎ-তালাকপ্রাপ্ত মহিলা তিন কুরু পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে।(সূরা বাকারা, আয়াত নং- ২২৮)। এ আয়াতে قُرُوءٍ (কুরু) শব্দটির দু’টি অর্থ,যার একটি হলো حيض (হায়েয), অপরটি হলো طهر (তুহুর)। একটু লক্ষ্য করে দেখুন ,যিনি শুধু কোরান অনুযায়ী আমল করতে ইচ্ছুক, তিনি এ আয়াতের কোন্ অর্থের উপর আমল করবেন ? আবার কিছু আয়াত বাস্তবতার বিপরীত হুকুম বহন করে। যেমন:- وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ অর্থাৎ- আর যাদের রোযা রাখার সামর্থ আছে, তারা রোযা রাখার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে ফিদিয়া স্বরুপ খাদ্য দান করবে। অতএব যিনি শুধু কোরান অনুযায়ী আমল করতে ইচ্ছুক, তিনি কিভাবে এ আয়াতের উপর আমল করবেন ?
অনূরুপভাবে কোরানের কিছু আয়াতের সাথে কিছু হাদিসের বিরোধ দেখা যায়। যেমন:- আল্লাহ তায়ালার বানী - وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ অর্থাৎ- আর যখন (নামাজের মধ্যে) কোরান পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনযোগ দিয়ে তা শ্রবন করো এবং চুপ থাকো। অবশ্যই তোমরা রহমত প্রাপ্ত হবে। এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, জামায়াতে নামাজ আদায়ের সময় মুক্তাদির কোরান পাঠ করা জায়েজ নেই। কিন্তু এর বিপরীতে সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে - لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الكِتَابِ অর্থাৎ- যে ব্যক্তি নামাজের মধ্যে সূরা ফাতিহা পাঠ করবেনা, তার নামাজ হবে না। এ হাদিস দ্বারা বুঝা যায় যে, ইমাম, মুক্তাদি এবং একাকী নামাজ আদায়কারী সকলের জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা আবশ্যক।
আবার কখনো কখনো দু’ই হাদিসের মধ্যে মতবিরোধ দেখা যায়। যেমন:- এক সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে- عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ، قَالَ: أَلَا أُصَلِّي بِكُمْ صَلَاةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ্রفَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا مَرَّةً وَاحِدَةًগ্ধ অর্থাৎ- রঈসুল ফোকাহা ও প্রবীন সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি কি আপনাদেরকে নিয়ে রাসূল (সঃ) এর নামাজ (যেভাবে তিনি নামাজ পড়তেন) আদায় করব না ? বর্ণনাকারী আলকামা (রহ) বলেন, অতপর তিনি শুধুমাত্র তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত উত্তোলন করে নামাজ আদায় করলেন। অতএব এ হাদিস প্রমাণ করে, রুকুতে যাওয়া ও উঠার সময় হাত উত্তোলন না করা। কিন্তু এর পাশাপশি অন্য এক সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ إِذَا افْتَتَحَ، وَإِذَا رَكَعَ، وَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ، وَلَا يُجَاوِزُ بِهِمَا أُذُنَيْهِ অর্থাৎ- বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (সঃ) নামাজে তাকবীরে তাহরীমা এবং রুকুতে যাওয়া ও উঠার সময় হাত উত্তোলন করতেন। তবে তিনি দু হাতকে কানের চেয়ে বেশী উঠাতেন না। এ হাদিস প্রমাণ করে, রুকুতে যাওয়া ও উঠার সময় হাত উত্তোলন করাকে। অতএব যিনি সরাসরি কোরান-হাদিস অনুযায়ী আমল করতে ইচ্ছুক, এমতাবস্থায় তিনি কিভাবে আমল করবেন ?
আবার আমাদের সমাজে আমাদেরই কিছু ভাইয়েরা বুখারী শরীফ সহ আরো কিছু হাদিসের শুধুমাত্র বাংলা অনুবাদ পড়েই বিভিন্ন মাসয়ালার দলিল-প্রমাণ পেশ করতে থাকেন। আবার কখনো কখনো কোনো মাসয়ালা বললেই প্রশ্ন তুলে থকেন, এটা কি সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ? সে ক্ষেত্রে আমরা বলব, সহীহ হাদিস কাকে বলে ? সহীহ হাদিস কি বুখারী বা বুখারী ও মুসলিম বা সিহাহ সিত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ? সহীহ হাদিস যদি এ সব কিতাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আপনি ইমাম বুখারী (রহ) এর নিজের বক্তব্য “আমার এক লক্ষ সহীহ হাদিস মুখস্ত আছে।”এর কি ব্যাখ্যা করবেন ? অথচ বুখারী শরীফ সহ সম্পূর্ণ সিহাহ সিত্তার মধ্যে মাত্র প্রায় ত্রিশ হাজার হাদিস আছে। এগুলো আলাদা করলেও ইমাম বুখারী (রহ) এর নিকট আরো প্রায় সত্তুর হাজার হাদিস আছে, যা সহীহ হিসাবে প্রমাণিত। আমার প্রশ্ন হলো, সে হাদিসগুলো কোথায় আছে ?
সংক্ষিপ্ত এ কথাগুলো সামনে রেখে বলব, আমরা কোরান-হাদিস অনুযায়ী আমল করব, এ কথা ঠিক। তবে যে মাসয়ালাগুলোর সমাধান স্পষ্টভাবে কোরান-হাদিসে নেই, সে ক্ষেত্রে আমরা সরাসরি কোরান-হাদিসের দিকে না গিয়ে বরং মুজতাহিদ ওলামায়ে কেরামের ফয়সালা অনুযায়ী যদি আমল করি, তাহলেই আমাদের আমলগুলো সঠিক ও বিশুদ্ধ হবে বলে আশা করা যায়। কারণ তারা জানেন, কোরান-হাদিসের বিধানের কোন্গুলো মানসুখ বা রহিত হয়েছে এবং কোন্গুলো হয়নি। যেহেতু তারা ছিলেন নববি যুগ ও সাহাবি যুগের একেবারেই সন্নিকটে। তারা সাহাবী ও বড় বড় তাবেয়ীদের আমল স্বচক্ষে দেখেছেন এবং শুনেছেন। তাই আলোচনা দীর্ঘায়ীত না করে মূল মাসয়ালার পর্যালোচনা ও সমাধানের দিকে আসি।
পবিত্র কোরান কারীমে আমাদের উপর রমজানের রোজা পালন ফরজ করা হয়েছে। যেমন:- আল্লাহ তায়ালা বলেন- فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ অর্থাৎ- অতএব তোমাদের যে কেহ (রমজান) মাসে উপস্থিত হবে, সে যেন রোজা পালন করে। হাদিস শরীফে তারাবীহ নামাজকে সুন্নাত বলা হয়েছে। যেমন:- নবি করীম (সঃ) বলেছেন- إِنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ وَسَنَنْتُ لَكُمْ قِيَامَهُ، فَمَنْ صَامَهُ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ অর্থাৎ- নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর রমজানের রোজাকে ফরজ করেছেন এবং আমি তোমাদের জন্য রমজানের রাতে তারাবীহকে সুন্নাত করে দিয়েছি। অতএব যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশা করে রোযা পালন করবে তার পিছনের কৃত অপরাধগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হবে। রোজা ফরজ ও তারাবীহ নামাজ সুন্নাত হওয়ার ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। তবে তারাবীহ নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে কিছুটা মতানৈক্য দেখা যায়। কেহ কেহ বলেন, আট রাকাত। অধিকাংশ আলেম-ওলামার মতে,বিশ রাকাত। ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ) ও তার লক্ষ লক্ষ অনুসারী, যারা বিখ্যাত ও প্রখ্যাত আলেম , ইমাম শাফেয়ী (রহ) ও তার লক্ষ লক্ষ অনুসারী, যারা বিখ্যাত ও প্রখ্যাত আলেম, ইমাম মালেক (রহ) ও তার লক্ষ লক্ষ অনুসারী, যারা বিখ্যাত ও প্রখ্যাত আলেম এবং ইমাম আহমাদ (রহ) ও তার লক্ষ লক্ষ অনুসারী, যারা বিখ্যাত ও প্রখ্যাত আলেম। এদের সকলের ঐক্যমত, তারাবীহ বিশ রাকাতের কম নয়। নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যার ব্যাপারে নবি করীম (সঃ) থেকে সহীহ কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে এতটুকু সহীহ হিসাবে পাওয়া যায় যা বুখারী শরীফে উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তাকে আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান জিজ্ঞাসা করেছিলেন, রাসূল (সঃ) রমজানে রাতের বলোয় কত রাকাত নামাজ পড়তেন ? তখন তিনি বলেছেন, مَا كَانَ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلاَ فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً অর্থাৎ- রাসূল (সঃ) রমজানে ও রমজানের বাহিরে এগার রাকাতের বেশী পড়তেন না। এখানে তিন রাকাত বিতর। বাকি আট রাকাত তরাবীহ না তাহাজ্জুদ, তা স্পষ্ঠভাবে বুঝা যায় না। কারণ রমজানের বাহিরে তারাবীহ নেই তবে তাহাজ্জুদ আছে। আর রমজানের ভিতরে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ উভয়টি আছে। এ ছাড়াও সহীহ বর্ণনায় আরো পাওয়া যায়- أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجَ لَيْلَةً مِنْ جَوْفِ اللَّيْلِ، فَصَلَّى فِي المَسْجِدِ، وَصَلَّى رِجَالٌ بِصَلاَتِهِ، فَأَصْبَحَ النَّاسُ فَتَحَدَّثُوا، فَاجْتَمَعَ أَكْثَرُ مِنْهُمْ فَصَلَّى فَصَلَّوْا مَعَهُ، فَأَصْبَحَ النَّاسُ فَتَحَدَّثُوا، فَكَثُرَ أَهْلُ المَسْجِدِ مِنَ اللَّيْلَةِ الثَّالِثَةِ، فَخَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَصَلَّى فَصَلَّوْا بِصَلاَتِهِ، فَلَمَّا كَانَتِ اللَّيْلَةُ الرَّابِعَةُ عَجَزَ المَسْجِدُ عَنْ أَهْلِهِ، حَتَّى خَرَجَ لِصَلاَةِ الصُّبْحِ، فَلَمَّا قَضَى الفَجْرَ أَقْبَلَ عَلَى النَّاسِ، فَتَشَهَّدَ، ثُمَّ قَالَ: ্রأَمَّا بَعْدُ، فَإِنَّهُ لَمْ يَخْفَ عَلَيَّ مَكَانُكُمْ، وَلَكِنِّي خَشِيتُ أَنْ تُفْتَرَضَ عَلَيْكُمْ، فَتَعْجِزُوا عَنْهَاগ্ধ، فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالأَمْرُ عَلَى ذَلِكَ অর্থাৎ- রাসূল (সঃ) রমজানে রাতের বলোয় মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়লেন এবং কিছু মানুষও তার সাথে একত্রিত হয়ে নামাজ পড়লেন। সকাল বেলায় এ বিষয়ে আলোচনা হলে পরবর্তি রাতে আরো বেশী লোক একত্রিত হয়ে তার সাথে নামাজ পড়লেন। সকাল বেলায় এ বিষয়ে আলোচনা হলে তৃতীয় রাতে আরো বেশী লোক একত্রিত হলো। রাসূল (সঃ) তাদেরকে নিয়ে নামাজ পড়লেন। ফলে চতুর্থ রাতে মসজিদ ভরপুর হয়ে গেলে। কিন্তু তিনি ফজর পর্যন্ত বের হয়ে আসলেন না। অতপর সকালে এসে ফজরের নামাজ পড়ে লোকদের দিকে ফিরে তাশাহুদ পাঠ করলেন। অতপর বললেন, তোমাদের অবস্থান আমার নিকট আশংকাজনক ছিলো না। তবে তোমাদের উপর এ নামাজ ফরজ হয়ে যাওয়ার আশংকা করতেছিলাম। কারণ, ফরজ হয়ে গেলে তোমরা অক্ষম হয়ে পড়বে। অতপর রাসূল (সঃ) ইন্তেকাল করলেন। বিষয়টি এরকমই রয়ে গেল। (বুখারী শরীফ) কিন্তু এখানেও রাকাত সংখ্যা উল্লেখ নাই। তবে মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বার মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُصَلِّي فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً وَالْوِتْرَ অর্থাৎ- রাসূল (সঃ) রমজানে বিশ রাকাত তারাবীহ ও বিতর নামাজ পড়তেন। এ হাদিসটিকে মুহাদ্দিসিনে কেরাম সনদের দিক থেকে দূর্বল বলেছেন
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এর জামানায় তারাবীহ নামাজ জামাতের সাথে বিশ রাকাত আদায়ের সুস্পষ্ঠ প্রমাণ পওয়া যায়। এ বিশ রাকাতের উপর অদ্য পর্যন্ত সকল মুসলমানের আমল চলতেছে। এবং এর উপরেই উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত।
আমাদের সকলের একটি বিষয়ে ভালোভাবে জানা প্রয়োজন যে, যে সকল মাসয়ালার সমাধান সরাসরি কোরানে না পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে হাদিস শরীফ থেকে সমাধান নিতে হবে। হাদিস শরীফে সমাধান পাওয়া না গেলে, সাহাবা কেরামের আমল বা বক্তব্য থেকে সমাধান নিতে হবে। তাতেও যদি স্পষ্ঠ সমাধান পাওয়া না যায়, তাহলে কোরান-সুন্নাহ ও ইজমার আলোকে গবেষণা করে সমাধান নিতে হবে। এবং তদানুযায়ী আমল করতে হবে। সে হিসাবে আমরা সাহাবা কেরামের আমল বা বক্তব্য থেকে তারাবীহর রাকাত সংখ্যা স্পষ্ঠ করতে পারি। হযরত ওমর ও আলী (রাঃ) এর জামানাসহ সাহাবা কেরাম ও তাবেঈদের জামানা থেকেই তারাবীহর নামাজ বিশ রাকাত চলে আসতেছে। প্রমাণ স্বরুপ নি¤েœ কিছু দলিল পেশ করা হলো:-
দলিল নম্বর Ñ ১
মুয়াত্তা মালেক, হাদিস নম্বর ৩৮০- عَنْ يَزِيدَ بْنِ رُومَانَ أَنَّهُ قَالَ: كَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ، فِي رَمَضَانَ، بِثَلاَثٍ وَعِشْرِينَ رَكْعَةً অর্থাৎ- ইয়াযীদ ইবনে রুমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত ওমর (রাঃ) এর জামানায় মানুষেরা রমজানে বিশ রাকাত তারাবীহ ও তিন রাকাত বিতর নামাজ পড়তেন।

দলিল নম্বর Ñ ২
মা’রেফাতুস সুনান ওয়াল আছার, হাদিস নম্বর ৫৪০৯- عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ قَالَ: كُنَّا نَقُومُ فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً وَالْوِتْرِ হযরত ছায়েব ইবনে ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,আমরা ওমর (রাঃ) এর জামানায় রমজানে বিশ রাকাত তারাবীহ ও তিন রাকাত বিতর নামাজ পড়তাম। তবে মুয়াত্তা মালেকের মধ্যে হযরত ছায়েব ইবনে ইয়াযীদ থেকে হযরত ওমর (রাঃ) এর জামানায় আট রাকাত তারাবীহর আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায়, তা হলো-عن السائب بن يزيد أنه قال أمر عمر بن الخطاب أبى بنَ كعب و تميما الدارى ان يقوما للناس بإحدى عشرة ركعة হযরত ওমর (রাঃ) উবাই ইবনে কা’ব ও তামীমুদ দারী (রাঃ) কে লোকদের নিয়ে এগার রাকাত পড়তে আদেশ করেছেন।
উভয় বর্ণনার সমাধান দিতে গিয়ে সহীহ বুখারী শরীফের বিশ্ব বিখ্যাত ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘উমদাতুল কারী’ এর প্রণেতা আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী (রহ) ও ‘ফাতহুল কাদীর’ কিতাবের প্রণেতা আল্লামা কামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম (রহ) বলেন, হযরত ওমর (রাঃ) প্রথমে আট রাকাতের নির্দেশ দিয়েছিলেন, পরবর্তিতে বিশ রাকাতের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার উপর অদ্য পর্যন্ত মক্কা-মদীনাসহ সর্বত্রই আমল চলে আসছে। আর এই বিশ রাকাতের মতটিকে শক্তিশালী করে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত মারফু হাদিস, যা এসেছে বিখ্যাত হাদিসের কিতাব মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বার মধ্যে- أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُصَلِّي فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً وَالْوِتْرَ অর্থাৎ- রাসূল (সঃ) রমজানে বিশ রাকাত তারাবীহ ও বিতর নামাজ পড়তেন।
দলিল নম্বর Ñ ৩
ইমাম নাসাঈ (রহ) এর ‘সুনানে কুবরা’, হাদিস নম্বর-৪২৯১- عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: دَعَا الْقُرَّاءَ فِي رَمَضَانَ فَأَمَرَ مِنْهُمْ رَجُلًا يُصَلِّي بِالنَّاسِ عِشْرِينَ رَكْعَةً قَالَ: وَكَانَ عَلِيٌّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ يُوتِرُ بِهِمْ অর্থাৎ- ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন,তিনি রমজানে কারীদের কোনো একজনকে ডেকে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবীহর নামাজ পড়তে আদেশ করতেন। এবং তিনি নিজেই লোকদের নিয়ে বিতর নামাজ
দলিল নম্বর Ñ ৪
ইমাম নাসাঈ (রহ) এর ‘সুনানে কুবরা’, হাদিস নম্বর-৪২৯২- عَنْ أَبِي الْحَسْنَاءِ أَنَّ عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ أَمَرَ رَجُلًا أَنْ يُصَلِّيَ بِالنَّاسِ خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ عِشْرِينَ رَكْعَةً অর্থাৎ- হযরত আলী (রাঃ) রমজানে একজনকে ডেকে লোকদের নিয়ে পাঁচ তারবীহা অর্থাৎবিশ রাকাত নামাজ পড়তে আদেশ করতেন। এই হাদিস পূর্বের হাদিসকে শক্তিশালী করে।
দলিল নম্বর - ৫
মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস নম্বর- ৭৬৪৩ عَنْ نَافِعِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ: " كَانَ ابْنُ أَبِي مُلَيْكَةَ يُصَلِّي بِنَا فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً অর্থাৎ- ইবনে আবি মুলাইকা আমাদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত তারাবীহর নামাজ পড়তেন।
দলিল নম্বর - ৬
সহীহ বুখারী শরীফের বিশ্ব বিখ্যাত ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘উমদাতুল কারী’, ৮/২৪৬ অথবা ১১/১২৭ পৃষ্ঠায় আছে- عَن الْأَعْمَش عَن زيد بن وهب، قَالَ: كَانَ عبد الله بن مَسْعُود يُصَلِّي لنا فِي شهر رَمَضَان فَيَنْصَرِف وَعَلِيهِ ليل، قَالَ الْأَعْمَش: كَانَ يُصَلِّي عشْرين رَكْعَة ويوتر بِثَلَاث অর্থাৎ- হযরত আ’মাশ যায়েদ ইবনে ওহাব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) আমাদেরকে নিয়ে তারাবীহর নামাজ পড়তেন। অতপর রাত বাকি থাকতেই বাড়ি ফিরে যেতেন। বর্ণনাকারী আমাশ বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তারাবীহ বিশ রাকাত ও বিতর তিন রাকাত পড়তেন।
এ সকল দলিল দ্বারা স্পষ্ঠভাবে প্রমাণিত হয় যে, তারাবীহর নামাজ বিশ রাকাত। এখন আমরা বিভিন্ন মুহাদ্দিসিন ও ফোকাহা কেরামের বক্তব্য থেকে ‘তারাবীহর নামাজ বিশ রাকাত’ প্রমাণ করার চেষ্টা করব।
দলিল নম্বর - ৭ 
তিরমিযী শরীফের ‘বাবু কিয়ামে শাহরে রমজান’ অধ্যায় আছে- اكثر أَهْلِ العِلْمِ عَلَى مَا رُوِيَ عَنْ عُمَرَ، وَعَلِيٍّ، وَغَيْرِهِمَا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِشْرِينَ رَكْعَةً، وَهُوَ قَوْلُ الثَّوْرِيِّ، وَابْنِ الْمُبَارَكِ، وَالشَّافِعِيِّ. وقَالَ الشَّافِعِيُّ: وَهَكَذَا أَدْرَكْتُ بِبَلَدِنَا بِمَكَّةَ يُصَلُّونَ عِشْرِينَ رَكْعَةً অর্থাৎ- ইমাম তিরমিযী (রহ) বলেন, অধিকাংশ মুহাদ্দিসিন ও ফোকাহা কেরামের নিকট তারাবীহর নামাজ বিশ রাকাত, যা বর্ণিত আছে হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) সহ বিভিন্ন সাহাবা থেকে। আর ইহাই হযরত সুফইয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারক ও ইমাম শাফেয়ী (রহ) এর মত। ইমাম শাফেয়ী (রহ) বলেন, এভাবেই আমাদের মক্কার লোকদেরকে পেয়েছি যে, তারা বিশ রাকাত তারাবীহর নামাজ পড়তেন।
দলিল নম্বর- ৮
সহীহ বুখারী শরীফের বিশ্ব বিখ্যাত ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘উমদাতুল কারী’তে আছে - أما الْقَائِلُونَ بِهِ من التَّابِعين: فشتير بن شكل، وَابْن أبي مليكَة والْحَارث الْهَمدَانِي وَعَطَاء بن أبي رَبَاح، وَأَبُو البحتري وَسَعِيد بن أبي الْحسن الْبَصْرِيّ أَخُو الْحسن وَعبد الرَّحْمَن ابْن أبي بكر وَعمْرَان الْعَبْدي. وَقَالَ ابْن عبد الْبر: وَهُوَ قَول جُمْهُور الْعلمَاء، وَبِه قَالَ الْكُوفِيُّونَ وَالشَّافِعِيّ وَأكْثر الْفُقَهَاء، وَهُوَ الصَّحِيح عَن أبي بن كَعْب من غير خلاف من الصَّحَابَة. অর্থাৎ- আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী (রহ) বলেন, তাবেয়ীদের মধ্য থেকে বিশ রাকতে প্রবক্তা হলেন, শুতাইর ইবনে শিকল, ইবনু আবি মুলাইকা, হারেছ হামদানি, আতা ইবনে আবি রবাহ, আবুল বুহতারি, সাঈদ ইবনে আবুল হাসান, আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকর ও ইমরান আবদারী। মুহাদ্দিস ইবনে আব্দুল বার বলেন, ইহাই অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য। এর উপরই কুফা শহরের সকল ওলামা ও ইমাম শাফেয়ী (রহ) সহ অধিকাংশ ফোকাহাদের আমল। আর ইহাই সাহাবা কেরামের মতভেদ ছাড়াই হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) থেকে বিশুদ্ধ বর্ণনা।
দলিল নম্বর - ৯
ইমাম বুখারী (রহ) তার ‘তারিখে কাবীর’ কিতাবে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণনা করেন- أَبُو الخضيب قَالَ يحيى بْن مُوسَى قَالَ نا جَعْفَر بْن عون سَمِعَ أبا الخضيب الجعفِي كَانَ سويد بْن غفلة يؤمنا فِي رمضان عشرين ركعة. অর্থাৎ- জাফর ইবনে আওন আবু খুদাইব জুফীকে বলতে শুনেছেন যে, সুয়াইদ ইবনে গাফলাহ আমাদেরকে নিয়ে রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহর নামাজ পড়তেন।
প্রিয় পাঠক, একটু লক্ষ করে দেখুন, যারা বুখারী শরীফের যে হাদিস দিয়ে আট রাকাত তারাবীহর দলিল পেশ করে থাকেন অথচ তাতে ইমাম বুখারী (রহ) স্পষ্ঠ বলেন নাই যে, সেই আট রাকাত তারাবীহ না তাহাজ্জুদ। কিন্তু তিনি নিজেই রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহ নামাজের স্পষ্ঠ প্রমাণ দিয়েছেন, তার ‘তারিখে কাবীর’ কিতাবে, যা সুয়াইদ ইবনে গাফলাহ থেকে বর্ণিত। আর সুয়াইদ ইবনে গাফলাহর পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লামা ইমাম যাহাবী তার ‘সিয়ারে আলামিন নুবালা’ কিতাবে উল্লেখ করেন- قِيْلَ: لَهُ صُحْبَةٌ، وَلَمْ يَصِحَّ، بَلْ أَسْلَمَ فِي حَيَاةِ النَّبِيِّ -صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- وَسَمِعَ كِتَابَهُ إِلَيْهِم وَشَهِدَ اليَرْمُوْكَ. وَحدَّثَ عَنْ: أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيْقِ، وَعُمَرَ، وَعُثْمَانَ، وَعَلِيٍّ، وَأُبَيِّ بنِ كَعْبٍ، وَبِلاَلٍ، وَأَبِي ذَرٍّ، وَابْنِ مَسْعُوْدٍ, وَطَائِفَةٍ. অর্থাৎ- কেউ কেউ বলেন, তিনি একজন সাহাবী। তবে এ মত বিশুদ্ধ নয়। বরং তিনি একজন বিশিষ্ট তাবেঈ। তিনি নবীজীর যামানায়ই মুসলমান হয়েছিলেন কিন্তু নবীজীর সাক্ষাত পান নি। তিনি ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হযরত আবু বকর, ওমর, উসমান, আলী, উবাই ইবনে কা’ব, বিলাল, আবু যার, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) সহ আরো একদল সাহাবী থেকে হাদিস বর্ণনা করেন।
দলিল নম্বর- ১০
বিশ্ব বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা মোল্লা আলী কারী (রহ) তার ‘মিরকাতুল মাফাতীহ’ এর ৩য় খন্ডের ৩৪৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন- قَالَ ابْنُ تَيْمِيَةَ الْحَنْبَلِيُّ: اعْلَمْ أَنَّهُ لَمْ يُوَقِّتْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي التَّرَاوِيحِ عَدَدًا مُعَيَّنًا، بَلْ لَا يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ، وَلَا فِي غَيْرِهِ عَلَى ثَلَاثَ عَشْرَةَ رَكْعَةً، لَكِنْ كَانَ يُطِيلُ الرَّكَعَاتِ، فَلَمَّا جَمَعَهُمْ عُمَرُ عَلَى أُبَيٍّ كَانَ يُصَلِّي بِهِمْ عِشْرِينَ رَكْعَةً، ثُمَّ يُوتِرُ بِثَلَاثٍ، وَكَانَ يُخَفِّفُ الْقِرَاءَةَ অর্থাৎ- আল্লামা ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী (রহ) বলেন, জেনে রেখো! নবীজী (সঃ) তারাবীহ নামাজের নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করেন নি। বরং তিনি রমজানের ভিতরে ও রমজানের বাহিরে রাতে এগারো রাকাতের বেশী পড়তেন না তবে তাতে দীর্ঘ কেরাত পড়তেন। অতপর হযরত ওমর (রাঃ) যখন লোকদেরকে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) এর পিছনে একত্রিত করে দিয়েছেন, তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত তারাবীহ ও তিন রাকাত পড়তেন এবং কেরাত হালকা করতেন।
দলিল নম্বর- ১১
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী (রহ) তার ‘ফতোয়ায়ে মাজমুয়ার’ এর ২৩ খন্ডের ১১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন- إِنَّهُ قَدْ ثَبَتَ أَنَّ أبي بْنَ كَعْبٍ كَانَ يَقُومُ بِالنَّاسِ عِشْرِينَ رَكْعَةً فِي قِيَامِ رَمَضَانَ وَيُوتِرُ بِثَلَاثِ. فَرَأَى كَثِيرٌ مِنْ الْعُلَمَاءِ أَنَّ ذَلِكَ هُوَ السُّنَّةُ؛ لِأَنَّهُ أَقَامَهُ بَيْن الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَلَمْ يُنْكِرْهُ مُنْكِرٌ. অর্থাৎ- প্রমাণিত আছে, হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) রমজানে লোকদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত তারাবীহ ও তিন রাকাত পড়তেন। অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম এটাকেই সুন্নাত মনে করেছেন। কারণ হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) এ নামাজ পড়েছিলেন আনসার ও মুহাজির সাহাবীদের উপস্থিতিতে। অথচ তাদের কেউ
 এ নামাজকে অস্বীকার করেন নি।
দলিল নম্বর- ১২
মানারুল কারী শরহে মুখতাছারে সহীহ বুখারী এর ৩ খন্ডের ২৪০ ও ২৪১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে- فلما كان عهد عمر وعثمان صاروا يصلونها عشرين ركعة كما فحديث السائب بن يزيد، قال: " كانوا يقومون على عهد عمر بعشرين ركعة، وعلى عهد عثمان وعلي مثله "، قال الترمذي: وأكثر أهل العلم على ما روي عن عمر وعلي وغيرهما. اهـ. وهو مذهب الحنفية والشافعية والحنابلة والظاهرية. অর্থাৎ- হযরত ওমর ও উসমান (রাঃ) এর জামানায় লেকেরা রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহ নামাজ পড়তেন। যেমন- হযরত ছায়েব ইবনে ইয়াযীদ এর হাদিস। ইমাম তিরমিযী (রহ) বলেন, এটাই হানাফী, শাফেয়ী, হাম্বলী ও যাহেরীদের মাযহাব।
এ ছাড়াও ফিকহের কিতাব ফতোয়ায় আলমগীরী, শামী,আল ফিকহু আলাল মাজাহিবিল আরবায়া, বাদায়েউস সানায়ে, মাবসুত, তাবিনুল হাকায়েক, কানযুদ দাকায়েক, ইনায়া, বিনায়া, হেদায়া, আলহাবি লিল ফতওয়াসহ চার মাযহাবের শত শত ফিকহের কিতাব খুলে দেখুন, যাতে রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহর নামাজ স্পষ্ঠ প্রমাণিত। এ ছাড়াও মক্কা-মদীনাসহ বিশ্বের বড়-ছোট প্রায় সকল মসজিদে এখন পর্যন্ত বিশ রাকাত তারাবীহর নামাজ জামাতের সাথে আদায় হয়ে আসতেছে। আমাদের সর্বশেষ কথা হচ্ছে, এ সকল দলিল সামনে রেখে আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত দিন, তারাবীহর নামাজ কত রাকাত ? তাই হিংসা-বিদ্বেষের উর্ধ্বে থেকে সকলের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহকে খুশি করার নিয়াতে আমল করে জান্নাতের রাস্তা সহজ করে নেই। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমীন।
posting by
মো: মাহমুদুল হাসান আশরাফী     

Comments

  1. মাশাল্লাহ
    অনেক সুন্দর আলচনা

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খত্তানী রহ,

معارف الختني علي سنن الترميذي মা'য়ারিফুল খুতনি আ'লা সুনান আত তিরমিজি লেখক, আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খত্তানী রহ,  মরহুম মুহাদ্দিস,  ছারছিনা দারুস্সুন্নাহ জামেয়া মাদ্রাসা  নেছারাবাদ ,পিরোজপুর, বরিশাল  ।  গত কয়েকদিন আগে জরুরি কিছু কিতাব অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইউকেভিত্তিক একটি অনলাইন বুকশপ দেখছিলাম। চোখের সামনে এলো কয়েকটি দুর্লভ কিতাব। তন্মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশি শায়খুল হাদীসের লেখা সুনানে তিরমিযীর আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ। কিতাবের নাম " মাআরিফুল খুতনী আলা সুনানিত তিরমিযী"। এটি শায়খুল হাদীস মুহাম্মদ নিয়াজ মখদুম আল-খুতনী রাহিমাহুল্লাহ রচিত একটি আরবি কিতাব। জন্ম ও বংশ পরিচয়  বাংলাদেশে ইলমে দ্বীন প্রসারে অন্যতম নীরব সাধক, হাজার হাজার ওলামা মাশাইখ গড়ার কারিগর আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোত্তানী (রঃ)। যিনি এদেশে ইলম চর্চার জন্য নিজ জন্মভূমি সুদূর রুশীয় তুর্কিস্থানের খোতান থেকে এই সবুজ বাংলায় হিজরত করেছিলেন। আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানী (রহ.) 1914 খ্রিস্টাব্দে রুশীয় তুর্কিস্থানের খোতান প্রদেশের উইঘুর অঞ্চলের জিংজিয়াংয়ে  সম্ভ্রান্ত এক আলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ শতকের গোড়ার দি...

শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও তাদের খেদমত

শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও তাদের খেদমত:-  মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ কাওসার আলম দা:বা: দাওরা হাদিস (ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট), কামিল  A+ ( হাদিস,তাফসির,ফিকাহ) মুহাদ্দিস :  ছারছিনা দারুসসুনাহ নেছারিয়া দ্বীনিয়া , নেছারাবাদ,পিরোজপুর,বরিশাল । সাবেক  মুহাদ্দিস  :  দারুল আবরার মডেল মাদ্রাসা, রুপাতলী, বরিশাল  । সাবেক  মুফতি   :  ভান্ডারিয়া সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, রাজবাড়ী সদর, রাজবাড়ী  । بسم الله الرحمن الرحيم- الحمد لله رب العالمين- و الصلاة و السلام على معلم الإنس و الجان، سيدنا محمد العربى- على آلهٖ و أصحابه أجمعين- أما بعد: হে প্রিয় বৎস! যে তোমাকে ইলমে দীনের একটি হরফ শিক্ষা দিয়েছে, সে তোমার পিতা সমতুল্য। তার অধিকার রক্ষা করা তোমার উপর ওয়াজীব, যেমন রক্ষা করা ওয়াজীব পিতা-মাতার অধিকার। যেনে রেখো! শিক্ষক যদি মুত্তাকী-পরহেজগ ার হয়, তাহলে তার অধিকার পিতা-মাতার চেয়েও বেশী। কথাটি বুঝিয়ে বলছি, শুনে রেখো, হে বৎস! পিতা-মাতা সন্তানের হাত ধরে দুনিয়ার আগুণ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দীনি শিক্ষক তোমাকে দীন শিখিয়ে জাহান্নামের আগুণ ...

“দাড়িয়ে কাতার সোজা করুন” এর মাসয়ালা

“দাড়িয়ে কাতার সোজা করুন” এর মাসয়ালা :- লেখক: মুফতি কাওসার আলম দা:বা: দাওরা হাদিস (ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট), কামিল  A+ ( হাদিস,তাফসির,ফিকাহ) মুহাদ্দিস :  ছারছিনা দারুসসুনাহ নেছারিয়া দ্বীনিয়া , নেছারাবাদ,পিরোজপুর,বরিশাল । সাবেক  মুহাদ্দিস  :  দারুল আবরার মডেল মাদ্রাসা, রুপাতলী, বরিশাল  । সাবেক  মুফতি   :  ভান্ডারিয়া সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, রাজবাড়ী সদর, রাজবাড়ী  । প্রায়   মসজিদগুলোতে দেখা যায়, মুয়াজ্জিন বা অন্য কেউ একামতের পূর্বেই বলে থাকেন, “দাড়িয়ে কাতার সোজা করুন”। আর মুসল্লিগণ সবাই দাড়িয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হলো, মুয়াজ্জিনের এই বলাটি কি সুন্নাহ অনুযায়ী হচ্ছে? যদি না হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে সুন্নাহ পদ্ধতিটি কী? আরেকটি প্রশ্ন হয়, এই বলাটি কি মুয়াজ্জিন কর্তৃক হবে না ইমাম কর্তৃক হবে? উত্তর :- না। মুয়াজ্জিনের এই বলাটি সুন্নাহ অনুযায়ী হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সুন্নাহ পদ্ধতিটি হচ্ছে, যা সহীহ বুখারীর বর্ণিত হাদিস শরীফ ও ফেকাহ বা ফতোয়ার কিতাব অনুযায়ী, ইকামতের পরে বলা। আর এই বলাটি মুয়াজ্জিন কর্তৃক হবে না ইমাম কর্তৃক হবে। সহীহ বুখারীর ...