Skip to main content

শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও তাদের খেদমত

শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও তাদের খেদমত:- 

মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ কাওসার আলম দা:বা:
দাওরা হাদিস (ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট), কামিল  A+ ( হাদিস,তাফসির,ফিকাহ)
মুহাদ্দিস : ছারছিনা দারুসসুনাহ নেছারিয়া দ্বীনিয়া , নেছারাবাদ,পিরোজপুর,বরিশাল ।
সাবেক মুহাদ্দিস : দারুল আবরার মডেল মাদ্রাসা, রুপাতলী, বরিশাল  ।

সাবেক মুফতি ভান্ডারিয়া সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, রাজবাড়ী সদর, রাজবাড়ী  ।

بسم الله الرحمن الرحيم- الحمد لله رب العالمين- و الصلاة و السلام على معلم الإنس و الجان، سيدنا محمد العربى- على آلهٖ و أصحابه أجمعين- أما بعد:
হে প্রিয় বৎস! যে তোমাকে ইলমে দীনের একটি হরফ শিক্ষা দিয়েছে, সে তোমার পিতা সমতুল্য। তার অধিকার রক্ষা করা তোমার উপর ওয়াজীব, যেমন রক্ষা করা ওয়াজীব পিতা-মাতার অধিকার। যেনে রেখো! শিক্ষক যদি মুত্তাকী-পরহেজগার হয়, তাহলে তার অধিকার পিতা-মাতার চেয়েও বেশী। কথাটি বুঝিয়ে বলছি, শুনে রেখো, হে বৎস! পিতা-মাতা সন্তানের হাত ধরে দুনিয়ার আগুণ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দীনি শিক্ষক তোমাকে দীন শিখিয়ে জাহান্নামের আগুণ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। এবার তুমি ভেবে দেখো, কার উপকার বেশী শক্তিশালী? তবে আমি পিতা-মাতার সম্মানকে খাটো করে দেখছি না। হে প্রিয় বৎস! বলোতো, সাহাবা আজমাঈনদের শিক্ষক কে ছিলেন? অবশ্যই বলবে, সে তো মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (দ)। তারা তাকে কিরকম সম্মান করতেন? অবশ্যই বলবে, সব চেয়ে বেশী। এমনকি পিতা-মাতার চেয়েও। যদি তোমাকে প্রশ্ন করি, অরাসাতুল আম্বিয়া কারা? তাহলে বলবে, হক্কানী আলেমগণ। আমি বলব, হক্কানী আলেমই তো তেমার দীনি শিক্ষক। যারা নবিদের স্থলাভিষিক্ত, তারা কি সম্মান পওয়ার বেশী উপযুক্ত নয়? নির্দিদ্বায় তুমি বলবে, তারাই সম্মান পওয়ার বেশী উপযুক্ত। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জটিল সমস্যা হলো, ছাত্ররা পিতা-মাতার আনুগত্য ও সম্মান যতটুকু করে, শিক্ষকদের সম্মান তার তুলনায় মোটেই করতে রাজী নয়। এর গুরুত্ব ততটা উপলদ্ধিও করে না। পিতা-মাতা, আতœীয়-স্বজনকেই প্রকৃত অভিভাবক মনে করে। অথচ ইলমে দীনের ক্ষেত্রে প্রকৃত মুরব্বি হলেন একমাত্র দীনি ওস্তাদ। নিয়ম হলো, ইলমে দীন অর্জনের জন্য পিতা-মাতা, আতœীয়-স্বজন খরচ বহনের অভিভাবকত্ব করবে আর মুত্তাকী শিক্ষককে অভিভাবক ও পরামর্শদাতা বানিয়ে নিজের জীবন গড়বে। যে-ই এটা বুঝতে ভুল করবে, সে-ই অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে।
* ইসলামের চত’র্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) শিক্ষকের মর্যদা দিতে গিয়ে বলেন, أنا عَبْدٌ مَنْ عَلَّمَنِى حَرْفًا وَاِحًدا، إنْ شَاءَ بَاعَ، وَ إِنْ شَاءَ أَعْتَقَ وَ إِنْ شَاءَ إِسْتَرَقَّ- অর্থাৎ- আমি তার গোলাম, যিনি আমাকে একটি হরফ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি চাইলে আমাকে বিক্রি করতে পারেন, অথবা মুক্ত করতে পারেন। আবার চাইলে দাসও বানিয়ে রাখতে পারেন।
* تَعْلِيْمُ المُتعَلِّم কিতাবে লেখা আছে- শিক্ষকের সম্মানার্থে তাকে এক হরফ শিক্ষা দেওয়ার জন্য এক হাজার দেরহাম দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকের সম্মান করলে নিজের জীবন ধন্য হয়, তার অসম্মান করলে নিজের জীবন ধ্বংস হয়।
* তালিমুল মুতায়াল্লিম কিতাবে আছে- إِنَّ الْعِلْمَ لَا يُفِيْدُ صَاحِبَهُ إِنْ لَمْ يَحْتَرِمْ أَسَاتِذَتَهُ وَ مُعَلِّمِيْهِ অর্থাৎ- যতক্ষণ পর্যন্ত ছাত্র শিক্ষকের সম্মান করবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ইলম দ্বারা ফায়েদা লাভ করতে পারবে না।
* বলা হয়ে থাকে, مَا وَصَلَ مَنْ وَصَلَ إِلَّا بالْحُرْمَةِ ـ وَ مَا سَقَطَ مَنْ سَقَطَ إِلَّا بِتَرْكِ الْحُرْمَةِ ـ অর্থাৎ- যে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছেছে, সে সম্মান রক্ষার কারণেই পৌছেছে। আর যে ব্যর্থ হয়েছে, সে সম্মান রক্ষা না করার কারণেই হয়েছে।
* আল্লামা শায়েখ ইলিয়াস (রহ) ইন্তেকালের পূর্বে ছাত্রদের উপদেশ স্বরুপ বলেছিলেন, “তোমরা শিক্ষকদের সম্মান করবে এবং তাদের সাথে আদব রক্ষা করে চলবে। শিক্ষকই হলেন ইলমে দীন হাসিলের সবচেয়ে বড় অসিলা। যিনি দীন সম্পর্কিত একটি শব্দ বা বাক্য কাউকে শিক্ষা দিবেন, তিনি তার মনিবতুল্য”।
* ইমাম আবু ইউসুফ (রহ) বলেন, مَنْ غفَلَ عَنْ حَقِّ الأُسْتَاذِ لَا يُفْلِحُ أَبَدًا- অর্থাৎ- যে ছাত্র শিক্ষকের হক আদায়ে অমনযোগী, সে কখনোই সফলকাম হবে না।
* خُلَاصَةُ الْفَتْوىٰ কিতাবে আছে, “ছাত্রদের উচিত, শিক্ষকদের আগে আগে কথা না বলা। শিক্ষকদের বসার স্থানে না বসা। এমনকি তাদের অনুপস্থিতেও নয়”। আলেমদের সাথে বেয়াদবী করলে তার পরিণতি কি হয়, তার দৃষ্টান্ত স্বরুপ
* আল্লামা মুনাজির আহসান জিলানী বলেন, “ হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বিশিষ্ট তাবেয়ী সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রহ) কে নির্মমভাবে হত্যা করার পর স্বপ্নে দেখেন, সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রহ) তার জামা টেনে ধরে বলতেছেন, হে আল্লাহর দুশমন! কি কারণে আমাকে হত্যা করলে? তৎক্ষণাৎ আতঙ্কিত অবস্থায় জাগ্রত হয়ে বললেন, আমার সাথে সাঈদের কি হলো? তাকে হত্যা করার পর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের শরীরে ঠান্ডাজনিত প্রচন্ড কাপুনি রোগ দেখা দিল। অন্তর থেকে সমস্ত শরীর বরফের মত ঠান্ডা হয়ে গেল। ফলে তার আদেশে লোকেরা জ¦লন্ত কয়লা দিয়ে সমস্ত শরীরে তাপ দিতে লাগল। কিন্তু তাতে তার রোগ আরো বাড়তেই লাগলো। অতপর ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে দেখলেন, তার শরীরের গোশতের প্রতিটি কোষে কোষে কীট আক্রমণ করে ফেলেছে এবং এর কোনো চিকিৎসাও নেই। নিরাশ হয়ে যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম হাসান বছরী (রহ) কে ডাকলেন, এবং নিজের জন্য দোয়ার আবেদন করলেন। হাসান বছরী (রহ) তার অবস্থা দেখে কেঁদে দিলেন এবং বললেন, হে হাজ্জাজ! আমি কি তোমাকে বলি নাই যে, আলেমদের সাথে বেয়াদবী করো না”।
* নবী করীম ﷺ বলেছেন, দাঁড়ি-চুল পাকা মুসলমান, কোরান বহনকারী (শিক্ষক) এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা আল্লাহকে সম্মান করার সমতুল্য।
* ইবনে ওহহাব (রহ) বলেন, إنَّمَا حَصَلَ مَا حَصَلَ مِنَ الْعِلْمِ بِفَضْلِ التَّعْظِيْمِ وَ الْإجْلِالِ لِلْإِمَامِ مَالِكِ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالىٰ অর্থাৎ- ইলম বা জ্ঞান থেকে যা হাসিল হয়েছে, তা হয়েছে একমাত্র ওস্তাদ ইমাম মালেক (রহ) কে সম্মান ও ইজ্জত করার কারণেই। ছাত্রের উচিত শিক্ষকের কথা মনযোগ দিয়ে শ্রবন করা। যদি তার কথা বুঝে না আসে, তাহলে বুঝার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাওয়া। শিক্ষকের সাথে হৈ-চৈ করা এবং তার সামনে অনর্থক কথা বলা বেয়াদবী। হে প্রিয় বৎস! শিক্ষকের সম্মান করো, নিজের জীবনের উন্নতির সোপান খুলে যাবে। জীবনে যদি বড় কিছু হতে চাও, শিক্ষকের সাথে আদব রক্ষা করিও। মনযোগের সাথে আমার কথাগুলো শ্রবন করো, সফলতা ফিরে আসবে। * ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ) বেয়াদবী হয়ে যাওয়ার আশংকায় তার উস্তাদের নাম পর্যন্ত মুখে উচ্চারণ করতেন না। প্রয়োজন হলে লকব দ্বারাই যথেষ্ট করতেন। হে ছাত্র! বেশী বেশী উস্তাদের সোহবাত লাভ করো।
* ইমাম বুখারী (রহ) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি কি কোনো কিছুর আকাঙ্খা করেন? তখন সে বলেছিল, হ্যা। যদি আমার ওস্তাদ আলী ইবনুল মাদিনী জীবিত থাকতেন, তাহলে আমি আমার সময়গুলো তার সোহবাতে ব্যয় করতাম।
হে ইলমে দীনের তালেব! সদা সর্বদা ওস্তাদের দোয়া নিবে। ওস্তাদের দোয়ার প্রভাব যে কত বেশী! শুন মন দিয়ে,
* “শাহ আব্দুর রহমান মুহাদ্দিস পানিপথী (রহ) একবার ছাত্র জীবনে লেখা-পড়ার জন্য নিজ এলাকা ‘পানিপথ’ ছেড়ে সাহারানপুর গিয়েছিলেন। রওয়ানা দেওয়ার পূর্বে তার সকল শিক্ষকের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কিন্তু সময়ের স্বল্পতার কারণে ছোট সময়ের একজন ওস্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেন নি। সাহারানপুর গিয়ে লেখা-পড়া আরম্ভ করলেন। কিন্তু শত চেষ্টা করেও পড়া মুখস্থ করতে পারছেন না, যা স্বরণ করেন তাও কোনো কাজে আসে না। অতপর সে ভয় পেয়ে চিন্তা করতে লাগলেন, পিছনে কিছু ঘটে গেল কি-না। কিছু দিন পর স্বরণে আসলো যে, সে তার এক শিক্ষকের সাথে সাক্ষাৎ করেন নি। এতে তিনি খুব আফসোস করলেন। অতপর ওজরখাহী করে খুব দ্রুত সেই শিক্ষকের নিকট চিঠি লিখলেন। সে চিঠিতে সাক্ষাৎ না করার অপরাধ স্বীকার করলেন ও ক্ষমা চাইলেন। এবং বললেন, আপনার প্রতি আমার কোনোই অবহেলা বা হেয় মনোভাব ছিল না বরং সময়ের সংকীর্নতা ও সুযোগের স্বল্পতাই ছিল আসল কারণ। প্রতি উত্তরে ওস্তাদ লিখলেন, হে আব্দুর রহমান! তুমি তোমার সকল শিক্ষকের সাথে সাক্ষাৎ করেছ আমি ব্যতিত। ফলে ভাবলাম, হয়তবা আমার মূল্য তেমার কাছে নেই। যেহেতু আমি তোমার নিচের ক্লাশের শিক্ষক। এই ভেবে মনে খুব ব্যথা অনুভব করলাম। কিন্তু তোমার চিঠি পেয়ে বুঝতে পারলাম যে, বিষয়টি সেরকম নয়। এখন আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট আছি। হৃদয় থেকে ক্ষমা করে দিলাম। শাহ আব্দুর রহমান মুহাদ্দিস পানিপথী (রহ) যখন চিঠির প্রতি উত্তর পেলেন, তখন হৃদয়ে শান্তি অনুভব করলেন এবং পূর্বের ন্যায় লেখা-পড়া আরম্ভ করলেন। এবার অল্পতেই তার সকল পড়া-লেখা মুখস্থ হতে লাগল এবং স্মৃতিশক্তি আরো বেড়ে গেল”। ছাত্রের উচিৎ, যদি কখনো শিক্ষকের সাথে বেয়াদবী হয়ে যায়, সাথে সাথে লজ্জিত হওয়া এবং বিলম্ব না করে দ্রুত তার নিকট গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
হে বৎস! তুমি কোন ধরনের জ্ঞান শিক্ষা করবে, তা তোমার মুত্তাকী-পরহেজগার শিক্ষক থেকে নির্বাচন করে নিবে।
* ইমাম বুখারী (রহ) তার ওস্তাদ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হাসান (রহ) এর নিকট গিয়ে ইসলামী অর্থনীতি শিক্ষার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তখন তিনি তাকে বললেন, আমি তোমার জন্য ইলমে হাদিস শিক্ষা করা ভালো মনে করি। শিক্ষকের পরামর্শ গ্রহণ করে ইলমে হাদিস চর্চায় মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ইমাম বুখারী (রহ) তার শিক্ষকের পরামর্শ গ্রহণ করার বরকতে "أَمِيْرُ المُؤْمِنِيْن فِى الحَدِيْثِ الشَّرِيْف" উপাধি লাভ করেছিলেন।
* মারজা মাযহার জানে জানান যিনি ইলমে হাদিসের সনদ লাভ করেছিলেন তার সম্মানিত শিক্ষক আলহাজ্জ্ব মুহাম্মাদ আফজাল (রহ) থেকে। মারজা মাযহার বলেন, ইলমে দীন হাসিলের শেষে আমার ওস্তাদ আমাকে একটি টুপি হাদিয়া দিয়েছিলেন, যা তিনি দীর্ঘ ১৫ বছর পর্যন্ত তার মাথায় পাগড়ীর নিচে পরিধান করেছিলেন। আমি টুপিটিতে ময়লা থাকার কারণে দীর্ঘ রাত পানিতে ভিজিয়ে রাখলাম। অতপর দেখলাম, দীর্ঘ দিন না ধোয়ায় টুপিতে ময়লা বেশী থাকার কারণে পানি কালো রং ধারণ করেছে। সকাল বেলায় আমি সবটুকু পানি পান করে ফেললাম। পানি পান করার পর দেখলাম যে,আমার ক্বলব নূরে ভরে গেল এবং কিতাব না বুঝার যে জটিলতা ছিল, তাও দূর হয়ে গেল। হে বৎস! আদবের নজীর লক্ষ্য কর,
* আল্লামা ইমাম রবী (রহ) বলেন, إنَّهُ لَمْ يُقَلِّبْ أَوْرَاقَ الْكِتَابِ بِالْقُوَّةِ خَشْيَةَ أن يَّتَأَذَّىٰ الْأسْتَاذُ بِهٰذا الصَّوْتِ - অর্থাৎ- তিনি তার শিক্ষকের কষ্ট পাওয়ার আশংকায় তার সামনে জোর আওয়াজে কিতাবের পৃষ্ঠা উল্টাতেন না। শিক্ষক ছাত্রের কোনো জানা বিষয়ে যদি আলোচনা করেন, তাহলে তার উচিৎ, তার সামনে নিজের ইলমকে প্রকাশ না করা। শিক্ষকের দূর্বলতা আলোচনা করা ছাত্রের জন্য বেয়াদবীমূলক আচরণ।
* رِسَالَةٌ إلىٰ الْجِيْلِ الْجَدِيْد কিতাবে আছে, لا يَنْقَطِعُ حَقَّ الْأسْتَاذِ بِإِنْقِطَاعِ لِقَائِهِ وَ الْإبْتِعَادِ عَنْهُ جِسْمًا بَلْ فِى فَتْرَةِ الْإنْقِطَاعِ أيْضًا يَجِبُ عَلىٰ التِّلْمِيْذِ أنْ يَتَفَقَّدَ أَحْوَالَهُ وَ يَشُدَّ الرِّحَالَ إلَيْهِ لِغَرْضِ الزِّيَارَةِ- অর্থাৎ- শিক্ষকের সাথে সাক্ষাৎ করার দ্বারাই তার অধিকার আদায় শেষ হয়ে যায় না। এবং শারীরিকভাবে তার থেকে দূরে থাকার দ্বারাও নয়। বরং শিক্ষক থেকে দূরে চলে গেলেও ছাত্রের জন্য আবশ্যক যে, সে সর্বদা তার খোজ-খবর নিবে এবং সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বাহন হাকাবে।
* শরহে তরীকাতে মুহাম¥াদিয়া কিতাবে লেখা আছে, “ইমাম হালওয়াই (রহ) একবার বুখারা শহর ত্যাগ করে অন্য এক শহরে চলে গেলেন। তখন ইমাম জারজুনী ব্যতিত সেখানকার সকল ছাত্র তার সাথে সাক্ষাত করেছিল। কিছুদিন পর ইমাম জারজুনী তার নিকট এসে মায়ের খেদমতের ওজর পেশ করল এবং যথাসময়ে সাক্ষাত না করতে পারার জন্য আফসোস প্রকাশ করল। তখন শিক্ষক ইমাম হালওয়াই (রহ) কে বললেন, “মায়ের খেদমতের দ্বারা তোমার হায়াতে বরকত হবে। তবে ইলমের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। আর বাস্তবে তা হয়েও ছিল”।
* تَعْلِيْمُ المُتعَلِّم কিতাবে লেখা আছে- “শায়খ ইমাম ছাদীদুদ্দিন সিরাজী বলেন, আমাদের মাশায়েখগণ বলতেন, যে ব্যক্তি তার ছেলেকে আলেম বানাতে চায়, তার উচিৎ শিক্ষকের সম্মান করা, মাঝে মাঝে খাবার খাওয়ানো ও হাদিয়া প্রদান করা। এতে যদি ছেলে আলেম নাও হয়, নাতি বা পরবর্তি কেউ আলেম হবে।
* تَعْلِيْمُ المُتعَلِّم কিতাবে আরো লেখা আছে- শিক্ষকের সম্মানের মধ্যে রয়েছে- তার আগে আগে না চলা, তার স্থানে না বসা, তার অনুমতি ব্যতিত তার সাথে কথা শুরু না করা, তার সামনে বেশী কথা না বলা, শিক্ষকের বিরক্তির অবস্থায় তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করা, তার সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা, তার দরজায় করাঘাত না করা, বরং ধৈর্যের সাথে বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা।
* হাকিমুল উম্মত শাহ আশরাফ আলী থানবী (রহ) বলেন, আল্লাহ তায়ালা আমাকে যা কিছু দিয়েছেন, শিক্ষকদের প্রতি মহব্বত ও সম্মানের কারণেই দিয়েছেন।
* খলিফা হারুন-অর রশীদ তার ছেলের লেখা-পড়ার খোজ খবর নেওয়ার জন্য শিক্ষক ইমাম আসমায়ী (রহ) এর নিকট খাদেম পাঠালেন। খদেম গিয়ে দেখল, ইমাম আসমায়ী অজুর শেষে পা ধৌত করতেছেন আর খলিফার ছেলে তার পায়ে পানি ঢালতেছেন। খলিফার নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি ইমাম আসমায়ী (রহ) কে বললেন, আমি আপনার নিকট আমার ছেলেকে জ্ঞান ও উত্তম আদব শিখার জন্য দিয়েছিলাম। আপনি যদি ছেলেকে আদব শিক্ষা দিতেন! অতপর খলিফা বললেন, আপনি যদি আমার ছেলেকে এক হাতে আপনার পায়ে পানি ঢালা ও আরেক হাত দিয়ে পা ধুয়ে দেওয়ার আদেশ করতেন, তাহলে আমি খুব আনন্দিত হতাম।
হে ছাত্র সমাজ ! একটু গভীর মনযোগ দিয়ে লক্ষ্য কর, কিভাবে শিক্ষকের খেদমত করতেন পূর্ব যুগের ছাত্ররা?
* শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ) শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ) এর খাছ ছাত্র ছিলেন। একবার ইংরেজরা শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ) কে বন্দি করে মাল্টা দ্বীপে নির্বাসন দেওয়ার জন্য জাহাজে উঠালেন। তখন ছাত্র শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ) ও খাদেম হিসাবে তার সাথে জাহাজে উঠতে চাইলেন। ইংরেজরা বলল, তুমিতো আমাদের দৃষ্টিতে কোনো অপরাধ কর নি। তাই তোমাকে কোনক্রমেই জাহাজে উঠানো যাবে না, এই বলে তারা জাহাজ ছেড়ে দিল। তখন ছাত্র শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ) ওস্তাদের বিয়োগ বেদনায় অস্থির হয়ে সমুদ্রে জাপ দেওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলেন। ইংরেজরা তখন বাধ্য হয়ে তাকেও শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ) এর সাথে জাহাজে তুলে নিলেন। (আমার প্রিয় ওস্তাদ আব্দুল গফফার কাসেমী (মা.জি) যিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় দীর্ঘদিন লেখা-পড়া করেছেন। বর্তমানে ছারছীনা দারুসসুন্নাত দীনিয়া মাদরাসার মুহাদ্দিস। তিনি বলেন,) ছাত্র ও শিক্ষক উভয়ে যখন মাল্টা দ্বীপে নির্বাসিত হলেন, তখন সেখানে দু’টি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিলো। এক. শীতের কারণে প্রচন্ড ঠান্ডা। দুই. রমজান মাস থাকার কারণে খতম তারাবীহের ব্যবস্থা না থাকা, যেহেতু ছাত্র ও শিক্ষক কেউ হাফেজ ছিলেন না। ছাত্র শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ) চিন্তায় পড়ে গেলেন যে, আমার ওস্তাদতো কখনোই খতম তারাবীহ ছাড়েন নি। দ্বিতীয়ত, এতো ঠান্ডার মধ্যে কিভাবে অজু করবেন? উভয় সমস্যা নিরসনের জন্য হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ) লোটায় পানি নিয়ে নিজের কোলে রেখে গরম করে শিক্ষকের অজুর পানির ব্যবস্থা করতেন। আর দৈনিক সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এক পারা করে কোরান মুখস্ত করে শিক্ষকের খতম তারাবীহের ব্যবস্থা করতেন। ঘটনাক্রমে হঠাৎ একদিন রাতে অজুর পানির ব্যবস্থা করতে না পারায় সকাল বেলায় অজু করার জন্য ঠান্ডা পানি পেশ করলে শিক্ষক বললেন, হুসাইন আহমাদ! আজকের পানি ঠান্ডা কেন? তখন শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ) সব ঘটনা খুলে বললেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আজ সেই ছাত্র শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ) ই শিক্ষকের দোয়ার বরকতে হয়ে গেলেন তামাম বাংলা, ভারত ও পাকিস্তানসহ বহু দেশের হাজার হাজার ছাত্রদের শিক্ষাগুরু।
* কাজী ইমাম ফখরূদ্দীন ইরছাবান্দী (রহ) এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যাকে তৎকালীন সকল মানুষ এমনকি বাদশাও খুব সম্মান করত। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেন, আমি আমার ওস্তাদ আবু ইয়াযীদ দাবুছীর বহু খেদমত করতাম। এমনকি ত্রিশ বছর পর্যন্ত আমি তার খাবার রান্না করেছি ; কিন্তু একদিনও সেখান থেকে সামান্যতম খাবার গ্রহণ করি নি। পরবর্তিতে তিনি শুকরিয়া স্বরুপ বলতেন, ওস্তাদের খেদমতের বরকতেই আমার আজকে এত মর্যাদা।
* হাকিমুল উম্মত শাহ আশরাফ আলী থানবী (রহ) ছাত্রজীবনে প্রতি জুমার দিনকে ওস্তাতদের খেদমতের জন্য নির্ধারণ করতেন। জুমার দিন তিনি তার শিক্ষক মাওলানা ইয়াকুব নানুতবী (রহ), মাওলানা দেহলবী (রহ), মাওলানা মানফায়াত আলী (রহ) সহ আরো অন্যান্য শিক্ষকদের এক ঘণ্টা করে খেদমত করতেন। উপরের আলোচনা থেকে আমরা যা-কিছু পেলাম:-
এক নজরে শিক্ষকদের প্রতি আদব
১. শিক্ষকের সাথে সচরাচর সাক্ষাত হলে, সালাম দিবে।
২. দীর্ঘদিন পরে সাক্ষাত হলে সালাম দিবে, মুছাফাহা ও কদম বুছী করবে।
৩. চলতিপথে সাক্ষাত হলে একপাশে দাড়িয়ে সালাম দিবে।
৪. ছাত্রাবাসে অবস্থান করলে মাঝে মাঝে শিক্ষকদের রুমে গিয়ে সাক্ষাত করবে।
৫. মাঝে মাঝে শিক্ষকদের খেদমত করবে। যেমন:- জামা-কাপড় ধুয়ে দিবে, তার রুম ঝাড়– দিবে বা অন্য যে কোনো ধরণের খেদমত করবে।
৬. যে সকল স্থানে শিক্ষক সচরাচর বসেন, সেখানে বসবে না।
৭. শিক্ষকের সাথে নম্র ভাবে কথা বলবে।
৮. শিক্ষকের সামনে উচু আওয়াজে কথা বলবে না।
৯. শিক্ষকের সাথে তর্ক করবে না।
১০. শিক্ষকের সাথে সর্বদা বিনয় প্রকাশ করবে।
১১. শিক্ষকের আদেশ-নিষেধ পালন করবে।
১২. সকল কাজে শিক্ষকের পরামর্শ নিবে।
১৩. শিক্ষক শ্রেণি কক্ষে প্রবেশ করলে দাড়িয়ে সালাম দিবে। অতপর চুপচাপ নিজ নিজ সীটে বসে যাবে।
১৪. শিক্ষককে হেয় বা অপমানজনক কোনো আচরণ করবে না।
১৫. শিক্ষকের সমালোচনা করবে না।
১৬. শিক্ষককে আটকানোর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করবে না।
১৭. মাঝে মাঝে শিক্ষকদের হাদিয়া দিবে।
১৮. শিক্ষকের কাজে সাহয্যের প্রয়োজন হলে, সাহায্য করবে।
১৯. শিক্ষকের মনে কষ্ট দিবে না।
২০. কোনো শিক্ষক বিপদে পড়লে যথাসম্ভব সাহায্য করবে।
২১. শিক্ষক ডাকলে গড়িমষি না করে তাড়াতাড়ি সাড়া দিবে।
২২. শিক্ষকদের আসবাব-পত্রের সম্মান করবে।
২৩. শিক্ষকের সামনে খালি গায়ে টুপিবিহীন আসবে না।
২৪. শিক্ষকদের সন্তানদেরকে ইজ্জত করবে।
২৫. শিক্ষকদের মনে ব্যথা দিয়ে থাকলে, ক্ষমা চেয়ে নিবে।
২৬. শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিভাবকের কাছে নালিশ দিবে না।
২৭. শিক্ষকের সামনে আসন গেড়ে বসবে না।
২৮. শিক্ষকের সাথে ছাত্রের সম্পর্ক মনের দিক দিয়ে। তাই এমন আচরণ করবে না যাতে তার মনে ব্যথা পায়।
২৯. শিক্ষক থেকে কোনো কাজ হাসিলের জন্য পিড়াপীড়ি করবে না।
৩০. মসজিদে শিক্ষকের সামনে আদব বজায় রেখে বসবে।
হে প্রিয় বৎস! তোমার ছাত্র জীবনটা উপরোক্ত বিষয়ের সাথে মিলিয়ে নাও। আর লক্ষ্য কর, তোমার ছাত্র জীবনের ত্রুটিগুলো কোন্ কোন্ জায়গায়। অতপর সংশোধন করে নাও তোমার জীবনটা। বড় যদি হতে চাও, বড়দের ছাচে জীবনকে গড়ার দৃঢ় পরিকল্পনা কর। সর্বশেষ, ইলমে দীনের প্রতিটি ছাত্রের প্রতি পরামর্শ, তোমরা এই লেখাটি একাধিক বার পড় আর ভুলগুলো সংশোধন করার চেষ্টা কর। আল্লাহ তায়ালার রহমতে অনেক অনেক অনে------ক বড় হয়ে যাবে। ইনশা আল্লাহ

posting by

মো: মাহমুদুল হাসান আশরাফী     

Comments

Popular posts from this blog

আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খত্তানী রহ,

معارف الختني علي سنن الترميذي মা'য়ারিফুল খুতনি আ'লা সুনান আত তিরমিজি লেখক, আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খত্তানী রহ,  মরহুম মুহাদ্দিস,  ছারছিনা দারুস্সুন্নাহ জামেয়া মাদ্রাসা  নেছারাবাদ ,পিরোজপুর, বরিশাল  ।  গত কয়েকদিন আগে জরুরি কিছু কিতাব অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইউকেভিত্তিক একটি অনলাইন বুকশপ দেখছিলাম। চোখের সামনে এলো কয়েকটি দুর্লভ কিতাব। তন্মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশি শায়খুল হাদীসের লেখা সুনানে তিরমিযীর আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ। কিতাবের নাম " মাআরিফুল খুতনী আলা সুনানিত তিরমিযী"। এটি শায়খুল হাদীস মুহাম্মদ নিয়াজ মখদুম আল-খুতনী রাহিমাহুল্লাহ রচিত একটি আরবি কিতাব। জন্ম ও বংশ পরিচয়  বাংলাদেশে ইলমে দ্বীন প্রসারে অন্যতম নীরব সাধক, হাজার হাজার ওলামা মাশাইখ গড়ার কারিগর আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোত্তানী (রঃ)। যিনি এদেশে ইলম চর্চার জন্য নিজ জন্মভূমি সুদূর রুশীয় তুর্কিস্থানের খোতান থেকে এই সবুজ বাংলায় হিজরত করেছিলেন। আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানী (রহ.) 1914 খ্রিস্টাব্দে রুশীয় তুর্কিস্থানের খোতান প্রদেশের উইঘুর অঞ্চলের জিংজিয়াংয়ে  সম্ভ্রান্ত এক আলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ শতকের গোড়ার দি...

“দাড়িয়ে কাতার সোজা করুন” এর মাসয়ালা

“দাড়িয়ে কাতার সোজা করুন” এর মাসয়ালা :- লেখক: মুফতি কাওসার আলম দা:বা: দাওরা হাদিস (ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট), কামিল  A+ ( হাদিস,তাফসির,ফিকাহ) মুহাদ্দিস :  ছারছিনা দারুসসুনাহ নেছারিয়া দ্বীনিয়া , নেছারাবাদ,পিরোজপুর,বরিশাল । সাবেক  মুহাদ্দিস  :  দারুল আবরার মডেল মাদ্রাসা, রুপাতলী, বরিশাল  । সাবেক  মুফতি   :  ভান্ডারিয়া সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, রাজবাড়ী সদর, রাজবাড়ী  । প্রায়   মসজিদগুলোতে দেখা যায়, মুয়াজ্জিন বা অন্য কেউ একামতের পূর্বেই বলে থাকেন, “দাড়িয়ে কাতার সোজা করুন”। আর মুসল্লিগণ সবাই দাড়িয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হলো, মুয়াজ্জিনের এই বলাটি কি সুন্নাহ অনুযায়ী হচ্ছে? যদি না হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে সুন্নাহ পদ্ধতিটি কী? আরেকটি প্রশ্ন হয়, এই বলাটি কি মুয়াজ্জিন কর্তৃক হবে না ইমাম কর্তৃক হবে? উত্তর :- না। মুয়াজ্জিনের এই বলাটি সুন্নাহ অনুযায়ী হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সুন্নাহ পদ্ধতিটি হচ্ছে, যা সহীহ বুখারীর বর্ণিত হাদিস শরীফ ও ফেকাহ বা ফতোয়ার কিতাব অনুযায়ী, ইকামতের পরে বলা। আর এই বলাটি মুয়াজ্জিন কর্তৃক হবে না ইমাম কর্তৃক হবে। সহীহ বুখারীর ...